প্রাথমিকের বই ছাপা বন্ধ, মাধ্যমিকেও শঙ্কা

আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের
মাধ্যমিকের ছাপা বই বাঁধাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। ঢাকার মাতুয়াইল এলাকার একটি ছাপাখানা থেকে তোলা।ছবি : নাসির উদ্দিন

কাগজ সংকট, জামানতের টাকা না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বেশিরভাগ ছাপাখানায় প্রাথমিকের বই ছাপানো বন্ধ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজও ফেরত দিয়েছে। পেপার মিলগুলো সিন্ডিকেট করে মজুত করা কাগজের দামও দফায় দফায় বাড়াচ্ছে। কাগজের সংকটের সঙ্গে একটানা থাকে না বিদ্যুৎ। এর ওপর আছে গ্লু আর প্লেটের সংকট। কালির দামও বাড়তির দিকে। এসব কারণে প্রাথমিকের ১০ কোটির পাশাপাশি মাধ্যমিকের বই ছাপানোর কাজ চালিয়ে নিতেও শঙ্কা দেখছেন প্রেস মালিকরা।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি এবং পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান কালবেলাকে বলেন, ‘অধিকাংশ প্রেসে প্রাথমিকের বই ছাপানো বন্ধ আছে। মাধ্যমিকের বই ছাপানোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ভালো মানের সংকটে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকে এক কোটি বই এখনো ছাপানো হয়নি। মাধ্যমিকের বই ছাপানোর গতিও কমেছে। পাঁচ কোটি বই চলে গেছে। আরও আড়াই কোটি প্রক্রিয়াধীন।’

প্রাথমিকে সবচেয়ে বেশি লট পেয়েছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস। জানতে চাইলে প্রেসটির মালিক কাওসার উজ্জামান রুবেলও জানিয়েছেন, কাগজ সংকটের কারণে প্রাথমিকে বই ছাপানো বন্ধ হয়ে আছে।

মুদ্রণকারীরা জানায়, ২০২৩ সালের জন্য এনসিটিবি ৩৩ কোটি ২৮ লাখ বই ছাপাচ্ছে। কিন্তু কাগজ সংকটে প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি ও ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির নতুন কারিকুলামের বই ছাপার কাজ এখনো শুরু হয়নি।

জানা গেছে, বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপার কাগজ উৎপাদনের মূল উপকরণ ‘ভার্জিন পাল্প’। আগে ছাতক, পাকশী ও কর্ণফুলী পেপার মিলে কিছু পাল্প তৈরি হলেও এখন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ডলার সংকটের কারণে আমদানি প্রায় বন্ধ। পেপার মিলগুলো এলসি করতে পারছে না। এতে পুরোনো কাগজ রিসাইকেল করে পাল্পবিহীন কাগজ উৎপাদন করছে মিলগুলো। কিন্তু সমস্যা হলো রিসাইক্লিং ফাইবারে তৈরি কাগজে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নির্দেশিত উজ্জ্বলতা আসে না। সম্প্রতি কয়েকটি ছাপাখানায় ৭০ শতাংশের কম জিএসএম কাগজেও বই ছাপার প্রমাণ পেয়েছে এনসিটিবি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রেস মালিক কালবেলাকে বলেন, ‘দেশের বড় পেপার মিলগুলোর কাছেই পাল্প নেই। তারা ভার্জিন পাল্প দিয়ে পেপার তৈরি করে। রিসাইকেলের মধ্যে ৫০ শতাংশ পাল্প মেশানো গেলে ৮২-৮৩ শতাংশ উজ্জ্বলতা আসে। কিন্তু তাদের কাছে দেওয়ার মতো সেই ৫০ শতাংশও নেই। সে কারণে তারা অফিস-আদালতের বাতিল কাগজ দিয়ে নতুন কাগজ তৈরি করছে। এতে ভালো মানের কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না।’

কাগজের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়তই : দেশে ১২০টির মতো কাগজ মিল রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টির মতো মিল এনসিটিবি নির্ধারিত মানের কাগজ উৎপাদন ও সরবরাহ করে। পাল্প আমদানি বন্ধ থাকা, গ্যাস সংকট, আনুষঙ্গিক অন্যান্য

পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে ১৫টি মিলের মধ্যে অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠান কাগজ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। এ কারণে কাগজের সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। ফলে সিন্ডিকেট করে মিলগুলো সংকট দেখিয়ে কাগজের দাম প্রতিনিয়তই বাড়াচ্ছে। তারা প্রেসগুলোকে দিচ্ছে নিম্ন মানের কাগজ। নভেম্বরের শুরুতে ৮০ জিএসএমের ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা দামের এক টন কাগজের দাম ছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। ৬০-৭০ জিএসএমের কাগজের দাম ছিল ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা। নভেম্বরের শুরুতে সেই কাগজের দাম লাখ ছাড়ায়। এখন তার দাম ১ লাখ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

পুরানা পল্টনের এক প্রেস মালিক কালবেলাকে বলেন, ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ৮০ জিএসএম কাগজের সর্বোচ্চ দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে ছিল ৮৮ হাজার টাকা। করোনার সময়ে এই কাগজের দাম কমে দাঁড়ায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। গত বছর আমরা সবচেয়ে ভালো মানের কাগজ, যাতে ৯০ শতাংশ উজ্জ্বলতা থাকে, এমন কাগজ কিনেছি ৭২ হাজার টাকায়। আর ৮০-৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতার কাগজ কিনেছি ৬৮-৭০ হাজার টাকায়। রিসাইকেল কাগজের উজ্জ্বলতা ৭৫-৭৮ শতাংশ। এটাও নিউজপ্রিন্টের মতোই। কিন্তু দাম ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।’

প্রেস মালিক ও মুদ্রণ শিল্প সমিতি জানায়, এবার প্রাথমিকের জন্য প্রায় ১০ কোটি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের বই ৬৬ লাখ। এগুলোর ৪০-৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৯৮ লট এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৯৮ লটে কাজ পেয়েছে প্রেসগুলো। কিন্তু প্রাথমিকে এক-পঞ্চমাংশ কাজ এখনো শেষ হয়নি।

ছাপাখানাগুলোর মালিকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সম্প্রতি প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে তারা বিলসহ প্রাথমিকের বই ছাপানোর সঙ্গে জড়িত সবকিছু এনসিটিবিকে দেখভালের অনুরোধ করেছে।

রাজধানীর মাতুয়াইলের এক প্রেস মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের টেন্ডার, চুক্তি, জরিমানা সবকিছু হয় এনসিটিবির সঙ্গে। কিন্তু টাকা আটকে থাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে। আবার বিল জমা দেওয়ার পর টাকা পেতে ২-৩ মাস সময় লাগে। তাই সবকিছু এনসিটিবির অধীনে এলে ভালো হয়।

১০ লটের কাজ নিয়ে বেকায়দায় এনসিটিবি মুদ্রাকরদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নিম্নমানের বই দিলে ছয় মাসের মধ্যে নতুন বই সরবরাহ তো করতেই হবে। পাশাপাশি জরিমানাও গুনতে হবে। কিন্তু ৯-১০ মাস পার হওয়ার পরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। শুধু তাই নয়, একটি বাদে গত বছর পাঠ্যপুস্তকের কাজ করা কোনো প্রতিষ্ঠানেরই জামানতের টাকা ফেরত দেয়নি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। ফলে কাগজ মিল মালিকদের দেনা পরিশোধ করতে পারেনি ছাপাখানাগুলো। এ কারণে তারা এবার যথা সময়ে কাগজের চাহিদাপত্র দিতে পারেনি। মিলগুলোও কাগজ উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহ করেনি। আবার জামানতের টাকা না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো এবার ব্যাংক থেকেও ঋণ পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকের বইয়ের কাজ নিয়েও না করার কথা জানিয়ে দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে আনন্দ প্রিন্টার্স, অ্যাপেক্স ও পেপার প্রসেসিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। তারা তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ১০ লটের কাজ ফিরিয়ে দিয়েছে।

এরপর পর্যায়ক্রমে সবচেয়ে কম দর দাতা, যাদের সক্ষমতা আছে, তাদের কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়; কিন্তু এনসিটিবির মানের কাগজে বাজারে কাগজের সংকট আছে, আবার দামও বেশি। তাই তারা রাজি না হওয়ায় গত সোমবার ৮টি প্রেসের মালিককে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়। এরপর মঙ্গলবার নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড প্রকাশ করা হয়। সে অনুযায়ী তারা ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সাড়া না দিলে মন্ত্রণালয় অন্য ব্যবস্থা নিবে।

সভায় উপস্থিত বাংলা বাজারের একটি প্রেসের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত বছর দুটি প্রতিষ্ঠান বাদে বাকি সব প্রতিষ্ঠানকে ২৫-৩০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে। অনুমানের ভিত্তিতে এই জরিমানা করায় প্রেসগুলো তাদের ওপর ক্ষুব্ধ। যে কারণে এখনো প্রাথমিকে বই ছাপানোর কাজ শুরু করা হয়নি। তারা সংকট কাটিয়ে কাজ শেষ করতে পারার নিশ্চয়তা পাচ্ছে না।’

কাগজ সংকট ও প্রাথমিকের বই নিয়ে জটিলতা তৈরির বিষয়টি স্বীকার করে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘এনসিটিবির মানের কাগজ সংকট আছে, এটি সত্য। কারণ, এনসিটিবির মানের কাগজ বাজারে পাওয়া যায় না, তৈরি করতে হয়। এবার ভার্জিন পাল্পের সংকট আছে। সাড়ে ৩শ ডলার থেকে বেড়ে এখন ৯৬০ ডলার হয়েছে। সে কারণে আমদানি বন্ধ রয়েছে।’

প্রেস মালিকদের আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী ও সচিব (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়), ডিজি (প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর) তাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে, এবার আর সমস্যা থাকবে না। এর ওপর তাদের আস্থা থাকা উচিত। তারা যদি কাজ না করে, একবারেই তো সময় শেষ হয়ে যায়নি। সরকারের হাতে অনেক বিকল্প আছে। সরকারকে ক্ষেপিয়ে কেউ পার পাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভার্জিন পাল্প যোগ না করলে ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতা আসে না। সেখানে আমরা বিচ্যুতি করে এরই মধ্যে ৮৩ করেছি। তবে, আমরা ভুল করেছি। আগামীতে এই উজ্জ্বলতার হার আরও কমতে পারে। অত উজ্জ্বল কাগজের ব্যবহারে বাচ্চাদের চোখের ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় পাঠ্যবইতে সাদা কাগজ ব্যবহার হয়।’

প্রাথমিকের বই ছাপা বন্ধ, মাধ্যমিকেও শঙ্কা

আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের
মাধ্যমিকের ছাপা বই বাঁধাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। ঢাকার মাতুয়াইল এলাকার একটি ছাপাখানা থেকে তোলা।ছবি : নাসির উদ্দিন

কাগজ সংকট, জামানতের টাকা না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বেশিরভাগ ছাপাখানায় প্রাথমিকের বই ছাপানো বন্ধ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজও ফেরত দিয়েছে। পেপার মিলগুলো সিন্ডিকেট করে মজুত করা কাগজের দামও দফায় দফায় বাড়াচ্ছে। কাগজের সংকটের সঙ্গে একটানা থাকে না বিদ্যুৎ। এর ওপর আছে গ্লু আর প্লেটের সংকট। কালির দামও বাড়তির দিকে। এসব কারণে প্রাথমিকের ১০ কোটির পাশাপাশি মাধ্যমিকের বই ছাপানোর কাজ চালিয়ে নিতেও শঙ্কা দেখছেন প্রেস মালিকরা।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি এবং পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান কালবেলাকে বলেন, ‘অধিকাংশ প্রেসে প্রাথমিকের বই ছাপানো বন্ধ আছে। মাধ্যমিকের বই ছাপানোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ভালো মানের সংকটে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকে এক কোটি বই এখনো ছাপানো হয়নি। মাধ্যমিকের বই ছাপানোর গতিও কমেছে। পাঁচ কোটি বই চলে গেছে। আরও আড়াই কোটি প্রক্রিয়াধীন।’

প্রাথমিকে সবচেয়ে বেশি লট পেয়েছে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস। জানতে চাইলে প্রেসটির মালিক কাওসার উজ্জামান রুবেলও জানিয়েছেন, কাগজ সংকটের কারণে প্রাথমিকে বই ছাপানো বন্ধ হয়ে আছে।

মুদ্রণকারীরা জানায়, ২০২৩ সালের জন্য এনসিটিবি ৩৩ কোটি ২৮ লাখ বই ছাপাচ্ছে। কিন্তু কাগজ সংকটে প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি ও ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির নতুন কারিকুলামের বই ছাপার কাজ এখনো শুরু হয়নি।

জানা গেছে, বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপার কাগজ উৎপাদনের মূল উপকরণ ‘ভার্জিন পাল্প’। আগে ছাতক, পাকশী ও কর্ণফুলী পেপার মিলে কিছু পাল্প তৈরি হলেও এখন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ডলার সংকটের কারণে আমদানি প্রায় বন্ধ। পেপার মিলগুলো এলসি করতে পারছে না। এতে পুরোনো কাগজ রিসাইকেল করে পাল্পবিহীন কাগজ উৎপাদন করছে মিলগুলো। কিন্তু সমস্যা হলো রিসাইক্লিং ফাইবারে তৈরি কাগজে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নির্দেশিত উজ্জ্বলতা আসে না। সম্প্রতি কয়েকটি ছাপাখানায় ৭০ শতাংশের কম জিএসএম কাগজেও বই ছাপার প্রমাণ পেয়েছে এনসিটিবি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রেস মালিক কালবেলাকে বলেন, ‘দেশের বড় পেপার মিলগুলোর কাছেই পাল্প নেই। তারা ভার্জিন পাল্প দিয়ে পেপার তৈরি করে। রিসাইকেলের মধ্যে ৫০ শতাংশ পাল্প মেশানো গেলে ৮২-৮৩ শতাংশ উজ্জ্বলতা আসে। কিন্তু তাদের কাছে দেওয়ার মতো সেই ৫০ শতাংশও নেই। সে কারণে তারা অফিস-আদালতের বাতিল কাগজ দিয়ে নতুন কাগজ তৈরি করছে। এতে ভালো মানের কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না।’

কাগজের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়তই : দেশে ১২০টির মতো কাগজ মিল রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টির মতো মিল এনসিটিবি নির্ধারিত মানের কাগজ উৎপাদন ও সরবরাহ করে। পাল্প আমদানি বন্ধ থাকা, গ্যাস সংকট, আনুষঙ্গিক অন্যান্য

পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে ১৫টি মিলের মধ্যে অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠান কাগজ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। এ কারণে কাগজের সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। ফলে সিন্ডিকেট করে মিলগুলো সংকট দেখিয়ে কাগজের দাম প্রতিনিয়তই বাড়াচ্ছে। তারা প্রেসগুলোকে দিচ্ছে নিম্ন মানের কাগজ। নভেম্বরের শুরুতে ৮০ জিএসএমের ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা দামের এক টন কাগজের দাম ছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। ৬০-৭০ জিএসএমের কাগজের দাম ছিল ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা। নভেম্বরের শুরুতে সেই কাগজের দাম লাখ ছাড়ায়। এখন তার দাম ১ লাখ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

পুরানা পল্টনের এক প্রেস মালিক কালবেলাকে বলেন, ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ৮০ জিএসএম কাগজের সর্বোচ্চ দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে ছিল ৮৮ হাজার টাকা। করোনার সময়ে এই কাগজের দাম কমে দাঁড়ায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। গত বছর আমরা সবচেয়ে ভালো মানের কাগজ, যাতে ৯০ শতাংশ উজ্জ্বলতা থাকে, এমন কাগজ কিনেছি ৭২ হাজার টাকায়। আর ৮০-৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতার কাগজ কিনেছি ৬৮-৭০ হাজার টাকায়। রিসাইকেল কাগজের উজ্জ্বলতা ৭৫-৭৮ শতাংশ। এটাও নিউজপ্রিন্টের মতোই। কিন্তু দাম ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।’

প্রেস মালিক ও মুদ্রণ শিল্প সমিতি জানায়, এবার প্রাথমিকের জন্য প্রায় ১০ কোটি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের বই ৬৬ লাখ। এগুলোর ৪০-৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৯৮ লট এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৯৮ লটে কাজ পেয়েছে প্রেসগুলো। কিন্তু প্রাথমিকে এক-পঞ্চমাংশ কাজ এখনো শেষ হয়নি।

ছাপাখানাগুলোর মালিকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সম্প্রতি প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে তারা বিলসহ প্রাথমিকের বই ছাপানোর সঙ্গে জড়িত সবকিছু এনসিটিবিকে দেখভালের অনুরোধ করেছে।

রাজধানীর মাতুয়াইলের এক প্রেস মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের টেন্ডার, চুক্তি, জরিমানা সবকিছু হয় এনসিটিবির সঙ্গে। কিন্তু টাকা আটকে থাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে। আবার বিল জমা দেওয়ার পর টাকা পেতে ২-৩ মাস সময় লাগে। তাই সবকিছু এনসিটিবির অধীনে এলে ভালো হয়।

১০ লটের কাজ নিয়ে বেকায়দায় এনসিটিবি মুদ্রাকরদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নিম্নমানের বই দিলে ছয় মাসের মধ্যে নতুন বই সরবরাহ তো করতেই হবে। পাশাপাশি জরিমানাও গুনতে হবে। কিন্তু ৯-১০ মাস পার হওয়ার পরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। শুধু তাই নয়, একটি বাদে গত বছর পাঠ্যপুস্তকের কাজ করা কোনো প্রতিষ্ঠানেরই জামানতের টাকা ফেরত দেয়নি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। ফলে কাগজ মিল মালিকদের দেনা পরিশোধ করতে পারেনি ছাপাখানাগুলো। এ কারণে তারা এবার যথা সময়ে কাগজের চাহিদাপত্র দিতে পারেনি। মিলগুলোও কাগজ উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহ করেনি। আবার জামানতের টাকা না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো এবার ব্যাংক থেকেও ঋণ পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকের বইয়ের কাজ নিয়েও না করার কথা জানিয়ে দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে আনন্দ প্রিন্টার্স, অ্যাপেক্স ও পেপার প্রসেসিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। তারা তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ১০ লটের কাজ ফিরিয়ে দিয়েছে।

এরপর পর্যায়ক্রমে সবচেয়ে কম দর দাতা, যাদের সক্ষমতা আছে, তাদের কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়; কিন্তু এনসিটিবির মানের কাগজে বাজারে কাগজের সংকট আছে, আবার দামও বেশি। তাই তারা রাজি না হওয়ায় গত সোমবার ৮টি প্রেসের মালিককে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়। এরপর মঙ্গলবার নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড প্রকাশ করা হয়। সে অনুযায়ী তারা ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সাড়া না দিলে মন্ত্রণালয় অন্য ব্যবস্থা নিবে।

সভায় উপস্থিত বাংলা বাজারের একটি প্রেসের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত বছর দুটি প্রতিষ্ঠান বাদে বাকি সব প্রতিষ্ঠানকে ২৫-৩০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে। অনুমানের ভিত্তিতে এই জরিমানা করায় প্রেসগুলো তাদের ওপর ক্ষুব্ধ। যে কারণে এখনো প্রাথমিকে বই ছাপানোর কাজ শুরু করা হয়নি। তারা সংকট কাটিয়ে কাজ শেষ করতে পারার নিশ্চয়তা পাচ্ছে না।’

কাগজ সংকট ও প্রাথমিকের বই নিয়ে জটিলতা তৈরির বিষয়টি স্বীকার করে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘এনসিটিবির মানের কাগজ সংকট আছে, এটি সত্য। কারণ, এনসিটিবির মানের কাগজ বাজারে পাওয়া যায় না, তৈরি করতে হয়। এবার ভার্জিন পাল্পের সংকট আছে। সাড়ে ৩শ ডলার থেকে বেড়ে এখন ৯৬০ ডলার হয়েছে। সে কারণে আমদানি বন্ধ রয়েছে।’

প্রেস মালিকদের আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী ও সচিব (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়), ডিজি (প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর) তাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে, এবার আর সমস্যা থাকবে না। এর ওপর তাদের আস্থা থাকা উচিত। তারা যদি কাজ না করে, একবারেই তো সময় শেষ হয়ে যায়নি। সরকারের হাতে অনেক বিকল্প আছে। সরকারকে ক্ষেপিয়ে কেউ পার পাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভার্জিন পাল্প যোগ না করলে ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতা আসে না। সেখানে আমরা বিচ্যুতি করে এরই মধ্যে ৮৩ করেছি। তবে, আমরা ভুল করেছি। আগামীতে এই উজ্জ্বলতার হার আরও কমতে পারে। অত উজ্জ্বল কাগজের ব্যবহারে বাচ্চাদের চোখের ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় পাঠ্যবইতে সাদা কাগজ ব্যবহার হয়।’