বৈষম্যমূলক শিক্ষা পদ্ধতি ও ঢাবির ক্রমাবনতি

এম আর খায়রুল উমাম

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমেই একটা উচ্চতর মাদ্রাসায় রূপ নিচ্ছে।’ বেশ কয়েক বছর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামখ্যাত ইতিহাসের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল এ মন্তব্য করেছেন। ইতিহাসের অধ্যাপকের কথাটি দেশের বৈষম্যমূলক শিক্ষা পদ্ধতিকেও নির্দেশ করে। মন্তব্যটি সাধারণ মানুষের মনে সে সময় আলোড়ন না তুললেও সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশবাসীর অহংকারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এ ধরনের আলোচনার প্রেক্ষাপট চিন্তারই বিষয়। এটা যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ এমনটা মনে করারও কোনো কারণ নেই। দেশের আরও যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেগুলোও যে এর বাইরে তা ভাবা যাচ্ছে না। বিশ্বাস করি, ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকেই তিনি এর আগেও এ ধরনের বক্তব্য রেখেছিলেন। গত কয়েক বছরে পরিবেশের আরও অবনতি ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে, ব্যবস্থাপনার অবনতি হয়েছে সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষেরও দ্বিমত নেই।

সাধারণ শিক্ষাকে ক্রমাগতভাবে মানহীন করার ক্ষেত্রে আমাদের নীতিনির্ধারকরা একটা সুযোগও হাতছাড়া করছেন বলে মনে হয় না। শিক্ষার উন্নয়নে যেসব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে তার বাহ্যিক রূপগুলোকে যদি একটার পর একটা সাজানো হয় তাহলে বোধ করি আর কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন পড়ে না। যেকোনো পদক্ষেপের পরপরই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত পেশাজীবীদের অংশ হিসেবে শিক্ষকসমাজ আহা-বেশ-বেশ-বেশ বলে লাফালাফি শুরু করে থাকেন। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার মানসিকতার মধ্যে তারা থাকতে পারছেন না। অথচ ভাষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বাধীনতা কত না উজ্জ্বলতর ঘটনার সাক্ষী আমাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা না থাকলে শিক্ষার্থীরা এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নিজেদের এমনভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারত না। কিন্তু আজকে মারামারি, হানাহানি, চাঁদাবাজি, দলবাজির কাছে অতীত হারিয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত। সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ছিল তা স্থবির হয়ে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বত্র ভর্তি পদ্ধতিতে এমন সব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের সুযোগ আছে বলে বিশ্বাস করা যায় না। সর্বপ্রথম বিবেচনায় আনা প্রয়োজন সবার জন্য উচ্চশিক্ষা দেশ ও জাতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে বলতে হয় মানবসম্পদ পরিকল্পনা না থাকার কারণে আমরা কেউ জানি না আমাদের প্রয়োজনীয়তার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের প্রতিযোগিতা দেখলে সাধারণ মানুষের বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। বিশাল কোচিং সাম্রাজ্য, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সাধারণ শিক্ষা-মাদ্রাসা শিক্ষার বিভক্তি ইত্যাদি কারণ বিবেচনায় না নিয়ে পরিস্থিতি বোঝা অবশ্য কঠিন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ-১৯৭৩-এর সুযোগ নিয়ে শিক্ষকরা দেশ ও জাতির কল্যাণের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতেন। মেধাবী, যোগ্য শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা ঘটাতে পারতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে দেওয়া যেকোনো নির্দেশ উপেক্ষা করে সর্বোত্তম শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারতেন। জ্ঞানতাপস শিক্ষকদের সামনে রেখে গবেষণার বিশাল ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তার বদলে সাধারণ মানুষ দেখল উপাচার্য হওয়ার ইঁদুরদৌড়, রাত ১০টায় তালা ভেঙে উপাচার্যের চেয়ারে বসা, একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্নীতির খবর, ছাত্রনেতাদের চাঁদাবাজি, শিক্ষক নিয়োগের নামে ভোটার নিয়োগদান কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শে শিক্ষকদের বর্ণিল হয়ে ওঠা। কোটায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী আবার কোটার সুযোগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেন।

দেশের বর্তমান রাজনীতি মারামারি-হানাহানি আর অবিশ্বাসে ভরপুর। পেশাজীবীদের ওপর এর কোনো প্রভাবে পড়বেন না তা কি হতে পারে? আর অন্যসব পেশাজীবীরা যেভাবে চলেছেন শিক্ষকরাও সেপথে হাঁটবেন স্বাভাবিক। আমাদের শিক্ষকসমাজ কি আজ তার সব শিক্ষার্থীকে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে ওঠে শুধু শিক্ষার্থী বিবেচনায় তাদের প্রতি নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারেন? আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে সচেতন মানুষের পক্ষে সে বিশ্বাস রাখা অত্যন্ত কঠিন। প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক দর্শন আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। নিজেকে অভিজাত-শ্রেণিভুক্ত করতে, পদপদবি বাগাতে রঙিন টিপের কার্যকারিতা-উপকারিতা দেখে এ প্রতিযোগিতায় দলে দলে পেশাজীবীদের ভিড়। এ ভিড় থেকে শিক্ষকরাও বাইরে নন। তাই বলে প্রকাশ্যে ললাটে রঙিন টিপ লাগিয়ে নিজেকে চেনানোর প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করে না।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিষয় বিভাজনের সময় দেখা যায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণভাবে অন্য বিভাগে তারা পড়াশোনা করতে চায় না। প্রায়ই অভিভাবকরা পর্যন্ত দেন-দরবার করে থাকেন যাতে সন্তান বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ পায়। অন্য বিভাগগুলো থেকেও শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। এসব মেধা ঈশ্বর প্রদত্ত এমনটা নয়। মেধাকে শানিত করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের শ্রমকে অবহেলা করা যাবে না কোনো অংশেই। সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতিই মেধার বিকাশ ঘটিয়ে থাকে। আমাদের সমাজে এমন হাজার লক্ষ মানুষ আছেন যারা নিজেদের শ্রমে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাই মেধাশূন্যরা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়Ñএমন কথা শোভন নয়। তবে দরিদ্র ঘরের সন্তানরা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে থাকে তা সত্যি এবং এদের মেধা বিকাশের সুযোগ সীমিত। সীমিত সুযোগের বিস্তার ঘটানোর কোনো উদ্যোগ বা কার্যক্রম আপাতত দেখা যায় না। আমাদের বিত্তবান শ্রেণির সন্তানদের জন্য পৃথক শিক্ষা গড়ে তোলার কারণে সাধারণ জনগণের শিক্ষা সর্বাংশেই অবহেলিত।

দেশের নীতিনির্ধারকরা শিক্ষা উন্নয়নে যেসব নীতি-কৌশল গ্রহণ করছেন তাতে আগামী দিনগুলো সুখকর হবে না। মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার নামে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যকরণ হয়ে যাচ্ছে। এসব পরিকল্পনা কে করল, কোথায় আলোচনা হলো, কারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তা সাধারণ মানুষ তো জানেই না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি তুলে কোনো লাভ আজ পর্যন্ত হয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুলে কলেজের দায়িত্ব পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সত্যিকারভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করত তাহলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না। দেশে যে বৈষম্যমূলক শিক্ষা গড়ে তোলা হচ্ছে সে ব্যাপারে বরেণ্য শিক্ষাবিদরা সোচ্চার হবেন, দরিদ্রের সন্তান যারা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করছে তাদের আরও দরিদ্র ও বেকার করার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে মুখ খুলবেনÑসেটাই সাধারণ সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের এই বিপন্নতার পেছনে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা আছে। শিক্ষকদেরই দায়িত্ব নিয়ে প্রমাণ করতে হবে সাধারণ মানুষের ধারণা ভুল।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও আইডিইবির সাবেক সভাপতি

বৈষম্যমূলক শিক্ষা পদ্ধতি ও ঢাবির ক্রমাবনতি

এম আর খায়রুল উমাম

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমেই একটা উচ্চতর মাদ্রাসায় রূপ নিচ্ছে।’ বেশ কয়েক বছর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামখ্যাত ইতিহাসের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল এ মন্তব্য করেছেন। ইতিহাসের অধ্যাপকের কথাটি দেশের বৈষম্যমূলক শিক্ষা পদ্ধতিকেও নির্দেশ করে। মন্তব্যটি সাধারণ মানুষের মনে সে সময় আলোড়ন না তুললেও সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশবাসীর অহংকারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এ ধরনের আলোচনার প্রেক্ষাপট চিন্তারই বিষয়। এটা যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ এমনটা মনে করারও কোনো কারণ নেই। দেশের আরও যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেগুলোও যে এর বাইরে তা ভাবা যাচ্ছে না। বিশ্বাস করি, ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকেই তিনি এর আগেও এ ধরনের বক্তব্য রেখেছিলেন। গত কয়েক বছরে পরিবেশের আরও অবনতি ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে, ব্যবস্থাপনার অবনতি হয়েছে সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষেরও দ্বিমত নেই।

সাধারণ শিক্ষাকে ক্রমাগতভাবে মানহীন করার ক্ষেত্রে আমাদের নীতিনির্ধারকরা একটা সুযোগও হাতছাড়া করছেন বলে মনে হয় না। শিক্ষার উন্নয়নে যেসব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে তার বাহ্যিক রূপগুলোকে যদি একটার পর একটা সাজানো হয় তাহলে বোধ করি আর কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন পড়ে না। যেকোনো পদক্ষেপের পরপরই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত পেশাজীবীদের অংশ হিসেবে শিক্ষকসমাজ আহা-বেশ-বেশ-বেশ বলে লাফালাফি শুরু করে থাকেন। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার মানসিকতার মধ্যে তারা থাকতে পারছেন না। অথচ ভাষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বাধীনতা কত না উজ্জ্বলতর ঘটনার সাক্ষী আমাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা না থাকলে শিক্ষার্থীরা এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নিজেদের এমনভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারত না। কিন্তু আজকে মারামারি, হানাহানি, চাঁদাবাজি, দলবাজির কাছে অতীত হারিয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত। সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ছিল তা স্থবির হয়ে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বত্র ভর্তি পদ্ধতিতে এমন সব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের সুযোগ আছে বলে বিশ্বাস করা যায় না। সর্বপ্রথম বিবেচনায় আনা প্রয়োজন সবার জন্য উচ্চশিক্ষা দেশ ও জাতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে বলতে হয় মানবসম্পদ পরিকল্পনা না থাকার কারণে আমরা কেউ জানি না আমাদের প্রয়োজনীয়তার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের প্রতিযোগিতা দেখলে সাধারণ মানুষের বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। বিশাল কোচিং সাম্রাজ্য, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সাধারণ শিক্ষা-মাদ্রাসা শিক্ষার বিভক্তি ইত্যাদি কারণ বিবেচনায় না নিয়ে পরিস্থিতি বোঝা অবশ্য কঠিন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ-১৯৭৩-এর সুযোগ নিয়ে শিক্ষকরা দেশ ও জাতির কল্যাণের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতেন। মেধাবী, যোগ্য শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা ঘটাতে পারতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে দেওয়া যেকোনো নির্দেশ উপেক্ষা করে সর্বোত্তম শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারতেন। জ্ঞানতাপস শিক্ষকদের সামনে রেখে গবেষণার বিশাল ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তার বদলে সাধারণ মানুষ দেখল উপাচার্য হওয়ার ইঁদুরদৌড়, রাত ১০টায় তালা ভেঙে উপাচার্যের চেয়ারে বসা, একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্নীতির খবর, ছাত্রনেতাদের চাঁদাবাজি, শিক্ষক নিয়োগের নামে ভোটার নিয়োগদান কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শে শিক্ষকদের বর্ণিল হয়ে ওঠা। কোটায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী আবার কোটার সুযোগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেন।

দেশের বর্তমান রাজনীতি মারামারি-হানাহানি আর অবিশ্বাসে ভরপুর। পেশাজীবীদের ওপর এর কোনো প্রভাবে পড়বেন না তা কি হতে পারে? আর অন্যসব পেশাজীবীরা যেভাবে চলেছেন শিক্ষকরাও সেপথে হাঁটবেন স্বাভাবিক। আমাদের শিক্ষকসমাজ কি আজ তার সব শিক্ষার্থীকে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে ওঠে শুধু শিক্ষার্থী বিবেচনায় তাদের প্রতি নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারেন? আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে সচেতন মানুষের পক্ষে সে বিশ্বাস রাখা অত্যন্ত কঠিন। প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক দর্শন আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। নিজেকে অভিজাত-শ্রেণিভুক্ত করতে, পদপদবি বাগাতে রঙিন টিপের কার্যকারিতা-উপকারিতা দেখে এ প্রতিযোগিতায় দলে দলে পেশাজীবীদের ভিড়। এ ভিড় থেকে শিক্ষকরাও বাইরে নন। তাই বলে প্রকাশ্যে ললাটে রঙিন টিপ লাগিয়ে নিজেকে চেনানোর প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করে না।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিষয় বিভাজনের সময় দেখা যায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণভাবে অন্য বিভাগে তারা পড়াশোনা করতে চায় না। প্রায়ই অভিভাবকরা পর্যন্ত দেন-দরবার করে থাকেন যাতে সন্তান বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ পায়। অন্য বিভাগগুলো থেকেও শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। এসব মেধা ঈশ্বর প্রদত্ত এমনটা নয়। মেধাকে শানিত করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের শ্রমকে অবহেলা করা যাবে না কোনো অংশেই। সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতিই মেধার বিকাশ ঘটিয়ে থাকে। আমাদের সমাজে এমন হাজার লক্ষ মানুষ আছেন যারা নিজেদের শ্রমে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাই মেধাশূন্যরা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়Ñএমন কথা শোভন নয়। তবে দরিদ্র ঘরের সন্তানরা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে থাকে তা সত্যি এবং এদের মেধা বিকাশের সুযোগ সীমিত। সীমিত সুযোগের বিস্তার ঘটানোর কোনো উদ্যোগ বা কার্যক্রম আপাতত দেখা যায় না। আমাদের বিত্তবান শ্রেণির সন্তানদের জন্য পৃথক শিক্ষা গড়ে তোলার কারণে সাধারণ জনগণের শিক্ষা সর্বাংশেই অবহেলিত।

দেশের নীতিনির্ধারকরা শিক্ষা উন্নয়নে যেসব নীতি-কৌশল গ্রহণ করছেন তাতে আগামী দিনগুলো সুখকর হবে না। মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার নামে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যকরণ হয়ে যাচ্ছে। এসব পরিকল্পনা কে করল, কোথায় আলোচনা হলো, কারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তা সাধারণ মানুষ তো জানেই না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি তুলে কোনো লাভ আজ পর্যন্ত হয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুলে কলেজের দায়িত্ব পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সত্যিকারভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করত তাহলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না। দেশে যে বৈষম্যমূলক শিক্ষা গড়ে তোলা হচ্ছে সে ব্যাপারে বরেণ্য শিক্ষাবিদরা সোচ্চার হবেন, দরিদ্রের সন্তান যারা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করছে তাদের আরও দরিদ্র ও বেকার করার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে মুখ খুলবেনÑসেটাই সাধারণ সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের এই বিপন্নতার পেছনে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা আছে। শিক্ষকদেরই দায়িত্ব নিয়ে প্রমাণ করতে হবে সাধারণ মানুষের ধারণা ভুল।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও আইডিইবির সাবেক সভাপতি