যতিনদের জুতো আর আগের মতো ছেঁড়ে না

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক

সুকুমার রায়ের প্রায় ১০০ বছর আগের লেখা গল্প ‘যতিনের জুতো’ শুরু হয় এভাবে- ‘যতিনের বাবা তাকে এক জোড়া জুতো কিনে দিয়ে আচ্ছা করে শাসিয়ে কইলেন, এইবারে যদি জুতো ছেঁড়ো, তাহলে ছেঁড়া জুতোই পরে থাকতে হবে। প্রতি মাসে যতিনের নতুন জুতোর দরকার হয়।’ যতিন যে বাবার কথা অমান্য করতে চায় তা নয়। ‘নতুন জুতো নিয়ে কিছুদিন যতিন বেশ সাবধানে চলাফেরা করল; ধীরে ধীরে সিঁড়ি থেকে নামে… সদা সতর্ক থাকে যেন হোঁচট না খায়। কিন্তু অতটুকুই সার। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার সেই পুরোনো যতিন।’ এবার আর কেবল ছেঁড়া নয়, সেই ছেঁড়া জুতো পায়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে চিতপটাং হয়ে যতিন একেবারে শয্যাশায়ী।

এখনকার যতিনদের বাবারা আর এভাবে শাসান কিনা, বা তাদের শাসাতে হয় কিনা ঠিক জানি না, কিন্তু এটা জানি যতিনদের জুতো আর সেভাবে ছেঁড়ে না। কারণটাও আমরা জানি। এখনকার জুতো হয়তো অনেক মজবুত, কিন্তু সেটা মূল কারণ নয়। মূল কারণটা হচ্ছে যতিনরা আর দৌড়াচ্ছে না। লেখাপড়া আর দালানকোঠার চাপে তারা পর্যাপ্ত সময় বা জায়গা পাচ্ছে না। শিক্ষক বা অভিভাবকরাও মনে করছেন খেলাধুলা করে সময় নষ্ট করার চেয়ে ঘরে কিংবা কোচিং সেন্টারে কতক্ষণ দম বন্ধ করে কিছু পড়া গিললে দুটো নম্বর আসবে। তীব্র প্রতিযোগিতাময় পরীক্ষার যুদ্ধক্ষেত্রে ওই নম্বর দুটোই রক্ষাকবচ। এই যুগে ওসব বাদ দিয়ে বালক-বালিকাদের আর বালখিল্য আচরণের কোনো মানে হয় না।

তবে তাঁরা যদি একটু চোখ-কান ভালো করে খুলে চারদিকে দেখতেন তাহলে হয়তো আর এভাবে ভাবতেন না। যে যুগ এসেছে সেখানে পরীক্ষার রেজাল্ট আর তেমন কাজে আসছে না। আইবিএম একবার পৃথিবীর ১৮০০ বড় কোম্পানির সিইওদের জিজ্ঞেস করেছিল, তাঁরা কাদের চাকরি দিতে আগ্রহী। তাঁরা কিন্তু ভালো ছাত্রদের কথা বলেননি। তাঁরা বলেছেন, যেসব মানুষ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে, বা যাঁরা সৃষ্টিশীল তাঁদেরই তাঁরা বেছে নেবেন। এর পাশাপাশি যদি তাঁদের ‘সহমর্মিতা’, ‘সহযোগিতা’ ও ‘সূক্ষ্ণচিন্তন দক্ষতা’র মতো সফট স্কিল থাকে তো আরও ভালো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষা দেওয়ার শিক্ষায় এসব দক্ষতা অর্জন করা কঠিন। এগুলো অর্জন করার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হচ্ছে খেলাধুলা করা। তবে সেটা প্রচলিত বিধিবদ্ধ কোনো খেলা না হলেই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় যদি খেলার নিয়মগুলো খেলোয়াড়রা নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। এই স্বাধীনতাটুকু থাকলে ওরা নিজেদের অজান্তেই খেলতে খেলতে সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞরা যে এ ধরনের খেলার কথা বলছেন তার কারণ আছে। হোমোসেপিয়েন্সরা যতদিন ধরে পৃথিবীতে আছে তার বেশিরভাগ সময়জুড়ে তারা শিকারি জীবনযাপন করেছে। ১০০০০ বছর আগে যে মানুষ কৃষিকাজ শুরু করল তার আগের ১ লাখ ৯০ হাজার বছর সে শিকারি জীবনযাপন করেছে। ওপরে যে দক্ষতার কথা সিইওরা বলেছেন সেসব দক্ষতা মানুষ আসলে ওই সময়কালেই অর্জন করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, মানবেতিহাসের দীর্ঘতম সময়জুড়ে চর্চিত হওয়ার কারণে সেগুলো এখন আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। তবে এটা ঠিক, গত ১০০০০ বছরের, বিশেষ করে গত কয়েক দশকের অনভ্যাসে সেই বিদ্যা এখন প্রায় নাশ হওয়ার উপক্রম। মনোবিজ্ঞানী পিটার গ্রে, যিনি শিক্ষায় খেলার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি তাঁর ‘ফ্রি টু লার্ন’ বইয়ে খেলতে খেলতে মানুষ কীভাবে এসব দক্ষতা অর্জন করেছে বা এখন মরচেপড়া সেসব দক্ষতায় কীভাবে আবার ধার দেওয়া যায় তার বর্ণনা দিয়েছেন।

শিকারি সমাজের বড় মানুষরা তাদের বাচ্চাদের খেলার জন্য অফুরন্ত সময় দিতেন। সেই সমাজে এ খেলাটাই ছিল শিক্ষা-সামাজিক দক্ষতা ও মূল্যবোধ চর্চা করার অন্তহীন আনন্দময় ক্ষেত্র। খেলতে খেলতেই তারা শিখে যেত কীভাবে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হয়, অন্যের প্রয়োজনে সাড়া দিতে হয়, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, অন্যের সঙ্গে আপসরফা করতে হয়, বা কীভাবে সমাজে সমতা বিধান করা যায় ইত্যাদি।

এখানে মজার কূটাভ্যাসটি হচ্ছে, তারা যে খেলতে খেলতে এগুলো শিখতে পারত তার কারণ এই খেলারূপ শিক্ষাটি বাধ্যতামূলক ছিল না। যে কেউ যে কোনো সময় ভালো না লাগলে খেলার মাঠ ত্যাগ করতে পারত। সেটা অবশ্য খুব কমই হতো, কারণ তাহলে তো অন্যদের সেই মহানন্দের খেলায় বিঘ্ন ঘটবে। ফলে সবাই খেয়াল রাখত যেন কেউ অসন্তুষ্ট না হয় এবং সবাই যেন সমান সুযোগ পায়। হয়তো এই কারণেই গবেষণায় দেখা গেছে মানবসভ্যতার ইতিহাসে একমাত্র শিকারি সমাজের খেলাতেই কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। অবশ্য এর আরেকটা কারণ আছে। নানা বয়সী শিশুরা একসঙ্গে খেলত বলে নিজের নৈপুণ্য দেখানোর চেষ্টা করলেও কেউ অন্যায়ভাবে কাউকে হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত না। অনেকে হয়তো ভাবছেন প্রতিযোগিতা করাও তো শিখতে হবে। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মানুষের যত অর্জন তা আসলে সে প্রতিযোগিতা করে নয়, সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পেয়েছে।

একুশ শতকে টিকে থাকার জন্য সিইওরা যেসব অবশ্য প্রয়োজনীয় সফট স্কিলগুলোর কথা বলেন, সেগুলো তো বটেই, এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্য লাভের জন্য খেলাধুলাই সবচেয়ে সহজ, কার্যকর ও আনন্দময় মাধ্যম। মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে খেলাধুলার যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে সেটা যতিনের বাবা না বুঝলেও মা ঠিকই বুঝেছিলেন। গল্পের শেষে তার আক্ষেপ, ‘ …আমার যতিন খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে … একদম ছটফটানি নেই! তা না হলে তার জুতো চার মাস টেকে কী করে!’

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক: মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক

যতিনদের জুতো আর আগের মতো ছেঁড়ে না

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক

সুকুমার রায়ের প্রায় ১০০ বছর আগের লেখা গল্প ‘যতিনের জুতো’ শুরু হয় এভাবে- ‘যতিনের বাবা তাকে এক জোড়া জুতো কিনে দিয়ে আচ্ছা করে শাসিয়ে কইলেন, এইবারে যদি জুতো ছেঁড়ো, তাহলে ছেঁড়া জুতোই পরে থাকতে হবে। প্রতি মাসে যতিনের নতুন জুতোর দরকার হয়।’ যতিন যে বাবার কথা অমান্য করতে চায় তা নয়। ‘নতুন জুতো নিয়ে কিছুদিন যতিন বেশ সাবধানে চলাফেরা করল; ধীরে ধীরে সিঁড়ি থেকে নামে… সদা সতর্ক থাকে যেন হোঁচট না খায়। কিন্তু অতটুকুই সার। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার সেই পুরোনো যতিন।’ এবার আর কেবল ছেঁড়া নয়, সেই ছেঁড়া জুতো পায়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে চিতপটাং হয়ে যতিন একেবারে শয্যাশায়ী।

এখনকার যতিনদের বাবারা আর এভাবে শাসান কিনা, বা তাদের শাসাতে হয় কিনা ঠিক জানি না, কিন্তু এটা জানি যতিনদের জুতো আর সেভাবে ছেঁড়ে না। কারণটাও আমরা জানি। এখনকার জুতো হয়তো অনেক মজবুত, কিন্তু সেটা মূল কারণ নয়। মূল কারণটা হচ্ছে যতিনরা আর দৌড়াচ্ছে না। লেখাপড়া আর দালানকোঠার চাপে তারা পর্যাপ্ত সময় বা জায়গা পাচ্ছে না। শিক্ষক বা অভিভাবকরাও মনে করছেন খেলাধুলা করে সময় নষ্ট করার চেয়ে ঘরে কিংবা কোচিং সেন্টারে কতক্ষণ দম বন্ধ করে কিছু পড়া গিললে দুটো নম্বর আসবে। তীব্র প্রতিযোগিতাময় পরীক্ষার যুদ্ধক্ষেত্রে ওই নম্বর দুটোই রক্ষাকবচ। এই যুগে ওসব বাদ দিয়ে বালক-বালিকাদের আর বালখিল্য আচরণের কোনো মানে হয় না।

তবে তাঁরা যদি একটু চোখ-কান ভালো করে খুলে চারদিকে দেখতেন তাহলে হয়তো আর এভাবে ভাবতেন না। যে যুগ এসেছে সেখানে পরীক্ষার রেজাল্ট আর তেমন কাজে আসছে না। আইবিএম একবার পৃথিবীর ১৮০০ বড় কোম্পানির সিইওদের জিজ্ঞেস করেছিল, তাঁরা কাদের চাকরি দিতে আগ্রহী। তাঁরা কিন্তু ভালো ছাত্রদের কথা বলেননি। তাঁরা বলেছেন, যেসব মানুষ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে, বা যাঁরা সৃষ্টিশীল তাঁদেরই তাঁরা বেছে নেবেন। এর পাশাপাশি যদি তাঁদের ‘সহমর্মিতা’, ‘সহযোগিতা’ ও ‘সূক্ষ্ণচিন্তন দক্ষতা’র মতো সফট স্কিল থাকে তো আরও ভালো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষা দেওয়ার শিক্ষায় এসব দক্ষতা অর্জন করা কঠিন। এগুলো অর্জন করার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হচ্ছে খেলাধুলা করা। তবে সেটা প্রচলিত বিধিবদ্ধ কোনো খেলা না হলেই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় যদি খেলার নিয়মগুলো খেলোয়াড়রা নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। এই স্বাধীনতাটুকু থাকলে ওরা নিজেদের অজান্তেই খেলতে খেলতে সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞরা যে এ ধরনের খেলার কথা বলছেন তার কারণ আছে। হোমোসেপিয়েন্সরা যতদিন ধরে পৃথিবীতে আছে তার বেশিরভাগ সময়জুড়ে তারা শিকারি জীবনযাপন করেছে। ১০০০০ বছর আগে যে মানুষ কৃষিকাজ শুরু করল তার আগের ১ লাখ ৯০ হাজার বছর সে শিকারি জীবনযাপন করেছে। ওপরে যে দক্ষতার কথা সিইওরা বলেছেন সেসব দক্ষতা মানুষ আসলে ওই সময়কালেই অর্জন করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, মানবেতিহাসের দীর্ঘতম সময়জুড়ে চর্চিত হওয়ার কারণে সেগুলো এখন আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। তবে এটা ঠিক, গত ১০০০০ বছরের, বিশেষ করে গত কয়েক দশকের অনভ্যাসে সেই বিদ্যা এখন প্রায় নাশ হওয়ার উপক্রম। মনোবিজ্ঞানী পিটার গ্রে, যিনি শিক্ষায় খেলার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি তাঁর ‘ফ্রি টু লার্ন’ বইয়ে খেলতে খেলতে মানুষ কীভাবে এসব দক্ষতা অর্জন করেছে বা এখন মরচেপড়া সেসব দক্ষতায় কীভাবে আবার ধার দেওয়া যায় তার বর্ণনা দিয়েছেন।

শিকারি সমাজের বড় মানুষরা তাদের বাচ্চাদের খেলার জন্য অফুরন্ত সময় দিতেন। সেই সমাজে এ খেলাটাই ছিল শিক্ষা-সামাজিক দক্ষতা ও মূল্যবোধ চর্চা করার অন্তহীন আনন্দময় ক্ষেত্র। খেলতে খেলতেই তারা শিখে যেত কীভাবে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হয়, অন্যের প্রয়োজনে সাড়া দিতে হয়, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, অন্যের সঙ্গে আপসরফা করতে হয়, বা কীভাবে সমাজে সমতা বিধান করা যায় ইত্যাদি।

এখানে মজার কূটাভ্যাসটি হচ্ছে, তারা যে খেলতে খেলতে এগুলো শিখতে পারত তার কারণ এই খেলারূপ শিক্ষাটি বাধ্যতামূলক ছিল না। যে কেউ যে কোনো সময় ভালো না লাগলে খেলার মাঠ ত্যাগ করতে পারত। সেটা অবশ্য খুব কমই হতো, কারণ তাহলে তো অন্যদের সেই মহানন্দের খেলায় বিঘ্ন ঘটবে। ফলে সবাই খেয়াল রাখত যেন কেউ অসন্তুষ্ট না হয় এবং সবাই যেন সমান সুযোগ পায়। হয়তো এই কারণেই গবেষণায় দেখা গেছে মানবসভ্যতার ইতিহাসে একমাত্র শিকারি সমাজের খেলাতেই কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। অবশ্য এর আরেকটা কারণ আছে। নানা বয়সী শিশুরা একসঙ্গে খেলত বলে নিজের নৈপুণ্য দেখানোর চেষ্টা করলেও কেউ অন্যায়ভাবে কাউকে হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত না। অনেকে হয়তো ভাবছেন প্রতিযোগিতা করাও তো শিখতে হবে। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মানুষের যত অর্জন তা আসলে সে প্রতিযোগিতা করে নয়, সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পেয়েছে।

একুশ শতকে টিকে থাকার জন্য সিইওরা যেসব অবশ্য প্রয়োজনীয় সফট স্কিলগুলোর কথা বলেন, সেগুলো তো বটেই, এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্য লাভের জন্য খেলাধুলাই সবচেয়ে সহজ, কার্যকর ও আনন্দময় মাধ্যম। মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে খেলাধুলার যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে সেটা যতিনের বাবা না বুঝলেও মা ঠিকই বুঝেছিলেন। গল্পের শেষে তার আক্ষেপ, ‘ …আমার যতিন খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে … একদম ছটফটানি নেই! তা না হলে তার জুতো চার মাস টেকে কী করে!’

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক: মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক