শিক্ষকদের অঙ্গীকার

২৭ অক্টোবর ২০২২ দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

২৭ অক্টোবর ২০২২ দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। শিক্ষক দিবস হলো শিক্ষকদের সম্মানার্থে পালিত একটি বিশেষ দিবস, যা বাংলাদেশ এবং ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য পালিত হয়ে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদ্যাপিত হলেও ১৯৯৫ সাল থেকে ৫ অক্টোবর ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিভিন্ন দেশে শিক্ষা দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়া হতে থাকে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশে কোনো বিখ্যাত শিক্ষক কিংবা উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জনকে উপলক্ষ করে এই দিবস পালন করা হয়। যেমন– ১১ সেপ্টেম্বর ডোমিনো ফসটিনো সার্মেন্তোর মৃত্যু দিবসে আর্জেন্টিনা শিক্ষক দিবস পালন করে। যদিও ভারত প্রথাগতভাবে হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে আষাঢ় (জুন-জুলাই) মাসের পূর্ণিমায় গুরুপূর্ণিমা (আধ্যাত্মিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের মঙ্গল কামনায় নিবেদিত) পালন করে।১৯৬২ সাল থেকে সর্বোপল্লি রাধাকৃষ্ণের জন্মদিনেও (৫ সেপ্টেম্বর) দেশটিতে শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের ১০০টি দেশে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এই দিবসটি পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (Education International- EI) ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রাখে। দিবসটি উপলক্ষে ইআই প্রতিবছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয় এবং শিক্ষকদের তাদের উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সম্মাননা দেয়া হয়।
‘শিক্ষকদের হাত ধরেই শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর শুরু’ প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী এবার পালন করা হয় দিবসটি। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সব মানুষকে এটাই বলা হচ্ছে যে, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারেন শিক্ষকরাই। শিক্ষাক্ষেত্রে যে কোনো পরিবর্তন অবশ্যই শিক্ষকদের দিয়ে শুরু করতে হয়। অর্থাৎ শিক্ষকের পরিবর্তন হলেই শিক্ষার্থীর পরিবর্তন হয়। আর তখনই শিক্ষার পরিবর্তন ঘটে।এর বাস্তব রূপ আমরা দেখেছি বিগত করোনাকালীন সময়ে করোনার তা-বে বিশ্বব্যাপী যখন সব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শিক্ষকরা বিকল্প পদ্ধতি তথা অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছিলেন। হঠাৎ করে দ্রুত অফলাইন থেকে অনলাইনে যেতে হলো। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষার রূপান্তরের জন্য আমাদের কতটুকু প্রস্তুতি ছিল কিংবা আমরা এবং শিক্ষার্থীরা কতটুকু সময় দিয়েছি- এই প্রশ্ন ছিল সবার।

শিক্ষার এই অনিবার্য আধুনিকীকরণ নিয়ে যদি ভবিষ্যতেও আমরা চিন্তা করতে ব্যর্থ হই, তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বিষয়টি অতি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে এ বছর জাতিসংঘের ‘ট্রান্সফর্মিং এডুকেশন’ অধিবেশনে। আগামী দিনে রূপান্তরিত এই শিক্ষার যাবতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা সেখানে তুলে ধরেছেন নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই, বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীসহ বিশ্বের বরেণ্য নেতৃবৃন্দ।দেশে রূপান্তরিত শিক্ষার মানসম্মত অবকাঠামো তৈরিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আইসিটি, টেলিকমিউনিকেশন অধিদপ্তর এবং এটুআই সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মমুখী শিক্ষা কারিকুলাম প্রণীত হয়েছে। আইসিটি শিক্ষার মাধ্যমে স্বাবলম্বী ও উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে দেশব্যাপী স্থাপিত হচ্ছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। যেখান থেকে তরুণ শিক্ষার্থীরা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে। আয় করছে বিদেশী মুদ্রা।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কমবেশি ২,২৮৩টি অধিভুক্ত কলেজে অধ্যয়ন করে ২৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী সংখ্যার বিবেচনায় এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি চালু আছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা খুব নগণ্য। মাত্র ৪-৫ জন শিক্ষক দিয়ে চার বছরের অনার্স কোর্স কিভাবে সমাপ্ত করা হয়, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।তবে শিক্ষক ও ক্লাসের সংখ্যা যাই হোক না কেন, নিয়মিত সমাপনী পরীক্ষার মাধ্যমে পাস করে বের হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পাচ্ছে ভালো গ্রেডও। এই চিত্রের বিপরীতটি লক্ষণীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭ কলেজে। এগুলোতে নিয়মিত ক্লাস ও প্রচুর পড়াশোনা করেও  ভালো গ্রেড পেতে হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

যা হোক, পড়াশোনার মান যাই হোক না কেন ২৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আয়ত্তে রাখছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অন্যথায় তারা বিপথগামী হয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ত। সমাজে দেখা দিত নানা বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি। সেক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক এই শিক্ষার্থীকে বিশ্বমানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা মোটেও কাম্য নয়।

পরিচ্ছন্ন ও সুষ্ঠু শিক্ষা বিস্তারের জন্য শিক্ষার্থীর অনুপাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহসহ যোগ্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ করা উচিত। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এমনভাবে নিশ্চিত করা উচিত, যাতে স্বচ্ছন্দে তারা জীবনযাপন করতে পারে।  দূর করা উচিত সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন বৈষম্য। বেসরকারি স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের  বাড়ি ভাড়া ও মহার্ঘ ভাতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ আছে।ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছামতো মাসিক বেতন এবং প্রতিবছর ভর্তি ফি নিয়ে থাকে, যা মোটেও কাম্য নয়। করোনাকালে অনেক প্রতিষ্ঠান ছাত্রের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকদের দেখা গেছে ফুটপাথে সবজি বিক্রি করতে। বন্ধ হওয়া ভাসমান স্কুলগুলো এখনো সচল হয়নি। ফলে, ন্যূনতম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ছিন্নমূল ও পথের শিক্ষার্থীরা। একই দেশে আছে নানারকম শিক্ষা কারিকুলাম- ইংলিশ মিডিয়াম, কারিগরি, মাদ্রাসা, কওমি, প্রচলিত বাংলা মাধ্যম এবং ইংলিশ ভার্সন ইত্যাদি।

বই ও পড়ার চাপে শিক্ষার্থীদের অবস্থা মরণপ্রায়। ছোট ছোট কচি শিশুরা একগাদা বই নিয়ে দিশাহারা। এ যেন সন্তানের স্থলে মা-বাবারই স্কুলে ভর্তি হওয়া! এসব অনিয়ম দূরীভূত হওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে বিঘ্নিত হচ্ছে কাক্সিক্ষত মানের লেখাপড়া। দৌরাত্ম্য বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের। প্রযুক্তির অপব্যবহারে হচ্ছে তারা বিপথগামী। দেখা দিচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন, শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা, জেল-জরিমানা দেয়া অবশ্যই গর্হিত কাজ এবং দ-নীয় অপরাধ।

তেমনি শাসন করার ছলে হাত-পা বেঁধে প্রহার করা, ক্লাসে পাঠদান না করে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনিতে বাধ্য করা, যৌন নির্যাতন করা কোন পিতৃতুল্য শিক্ষকের কাজ হতে পারে না। শিক্ষার সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে হলে সকলের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা একান্ত কাম্য। সত্যিকারের শিক্ষক হলেন একটি মোমবাতির মতো, যাঁরা নিজে প্রজ্বলিত হয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আলো প্রদান করেন।তাদের নির্দেশনা, বন্ধুত্ব, শৃঙ্খলা, শাসন এবং ভালোবাসা- এ সবই পাওয়া যায় শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এগুলো আমাদের জীবনকে আরও বেশি সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাদের জ্ঞানের আলোতেই একজন আদর্শ নাগরিকের বিকাশ ঘটে। ‘শিক্ষক দিবসে’ শিক্ষকদের সকল পাওয়া-না পাওয়া, অভিযোগ-অনুযোগ, সম্মান-লাঞ্ছনা ইত্যাদি ভুলে গিয়ে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হওয়া জরুরি। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত, পরিবেশ ও প্রযুক্তিবান্ধব এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থাই হোক শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার।

লেখক : অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকদের অঙ্গীকার

২৭ অক্টোবর ২০২২ দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

২৭ অক্টোবর ২০২২ দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। শিক্ষক দিবস হলো শিক্ষকদের সম্মানার্থে পালিত একটি বিশেষ দিবস, যা বাংলাদেশ এবং ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য পালিত হয়ে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদ্যাপিত হলেও ১৯৯৫ সাল থেকে ৫ অক্টোবর ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিভিন্ন দেশে শিক্ষা দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়া হতে থাকে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশে কোনো বিখ্যাত শিক্ষক কিংবা উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জনকে উপলক্ষ করে এই দিবস পালন করা হয়। যেমন– ১১ সেপ্টেম্বর ডোমিনো ফসটিনো সার্মেন্তোর মৃত্যু দিবসে আর্জেন্টিনা শিক্ষক দিবস পালন করে। যদিও ভারত প্রথাগতভাবে হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে আষাঢ় (জুন-জুলাই) মাসের পূর্ণিমায় গুরুপূর্ণিমা (আধ্যাত্মিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের মঙ্গল কামনায় নিবেদিত) পালন করে।১৯৬২ সাল থেকে সর্বোপল্লি রাধাকৃষ্ণের জন্মদিনেও (৫ সেপ্টেম্বর) দেশটিতে শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের ১০০টি দেশে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এই দিবসটি পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (Education International- EI) ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রাখে। দিবসটি উপলক্ষে ইআই প্রতিবছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয় এবং শিক্ষকদের তাদের উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সম্মাননা দেয়া হয়।
‘শিক্ষকদের হাত ধরেই শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর শুরু’ প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী এবার পালন করা হয় দিবসটি। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সব মানুষকে এটাই বলা হচ্ছে যে, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারেন শিক্ষকরাই। শিক্ষাক্ষেত্রে যে কোনো পরিবর্তন অবশ্যই শিক্ষকদের দিয়ে শুরু করতে হয়। অর্থাৎ শিক্ষকের পরিবর্তন হলেই শিক্ষার্থীর পরিবর্তন হয়। আর তখনই শিক্ষার পরিবর্তন ঘটে।এর বাস্তব রূপ আমরা দেখেছি বিগত করোনাকালীন সময়ে করোনার তা-বে বিশ্বব্যাপী যখন সব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শিক্ষকরা বিকল্প পদ্ধতি তথা অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছিলেন। হঠাৎ করে দ্রুত অফলাইন থেকে অনলাইনে যেতে হলো। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষার রূপান্তরের জন্য আমাদের কতটুকু প্রস্তুতি ছিল কিংবা আমরা এবং শিক্ষার্থীরা কতটুকু সময় দিয়েছি- এই প্রশ্ন ছিল সবার।

শিক্ষার এই অনিবার্য আধুনিকীকরণ নিয়ে যদি ভবিষ্যতেও আমরা চিন্তা করতে ব্যর্থ হই, তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বিষয়টি অতি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে এ বছর জাতিসংঘের ‘ট্রান্সফর্মিং এডুকেশন’ অধিবেশনে। আগামী দিনে রূপান্তরিত এই শিক্ষার যাবতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা সেখানে তুলে ধরেছেন নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই, বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীসহ বিশ্বের বরেণ্য নেতৃবৃন্দ।দেশে রূপান্তরিত শিক্ষার মানসম্মত অবকাঠামো তৈরিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আইসিটি, টেলিকমিউনিকেশন অধিদপ্তর এবং এটুআই সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মমুখী শিক্ষা কারিকুলাম প্রণীত হয়েছে। আইসিটি শিক্ষার মাধ্যমে স্বাবলম্বী ও উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে দেশব্যাপী স্থাপিত হচ্ছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। যেখান থেকে তরুণ শিক্ষার্থীরা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে। আয় করছে বিদেশী মুদ্রা।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কমবেশি ২,২৮৩টি অধিভুক্ত কলেজে অধ্যয়ন করে ২৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী সংখ্যার বিবেচনায় এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি চালু আছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা খুব নগণ্য। মাত্র ৪-৫ জন শিক্ষক দিয়ে চার বছরের অনার্স কোর্স কিভাবে সমাপ্ত করা হয়, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।তবে শিক্ষক ও ক্লাসের সংখ্যা যাই হোক না কেন, নিয়মিত সমাপনী পরীক্ষার মাধ্যমে পাস করে বের হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পাচ্ছে ভালো গ্রেডও। এই চিত্রের বিপরীতটি লক্ষণীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭ কলেজে। এগুলোতে নিয়মিত ক্লাস ও প্রচুর পড়াশোনা করেও  ভালো গ্রেড পেতে হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

যা হোক, পড়াশোনার মান যাই হোক না কেন ২৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আয়ত্তে রাখছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অন্যথায় তারা বিপথগামী হয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ত। সমাজে দেখা দিত নানা বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি। সেক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক এই শিক্ষার্থীকে বিশ্বমানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা মোটেও কাম্য নয়।

পরিচ্ছন্ন ও সুষ্ঠু শিক্ষা বিস্তারের জন্য শিক্ষার্থীর অনুপাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহসহ যোগ্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ করা উচিত। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এমনভাবে নিশ্চিত করা উচিত, যাতে স্বচ্ছন্দে তারা জীবনযাপন করতে পারে।  দূর করা উচিত সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন বৈষম্য। বেসরকারি স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের  বাড়ি ভাড়া ও মহার্ঘ ভাতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ আছে।ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছামতো মাসিক বেতন এবং প্রতিবছর ভর্তি ফি নিয়ে থাকে, যা মোটেও কাম্য নয়। করোনাকালে অনেক প্রতিষ্ঠান ছাত্রের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকদের দেখা গেছে ফুটপাথে সবজি বিক্রি করতে। বন্ধ হওয়া ভাসমান স্কুলগুলো এখনো সচল হয়নি। ফলে, ন্যূনতম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ছিন্নমূল ও পথের শিক্ষার্থীরা। একই দেশে আছে নানারকম শিক্ষা কারিকুলাম- ইংলিশ মিডিয়াম, কারিগরি, মাদ্রাসা, কওমি, প্রচলিত বাংলা মাধ্যম এবং ইংলিশ ভার্সন ইত্যাদি।

বই ও পড়ার চাপে শিক্ষার্থীদের অবস্থা মরণপ্রায়। ছোট ছোট কচি শিশুরা একগাদা বই নিয়ে দিশাহারা। এ যেন সন্তানের স্থলে মা-বাবারই স্কুলে ভর্তি হওয়া! এসব অনিয়ম দূরীভূত হওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে বিঘ্নিত হচ্ছে কাক্সিক্ষত মানের লেখাপড়া। দৌরাত্ম্য বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের। প্রযুক্তির অপব্যবহারে হচ্ছে তারা বিপথগামী। দেখা দিচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন, শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা, জেল-জরিমানা দেয়া অবশ্যই গর্হিত কাজ এবং দ-নীয় অপরাধ।

তেমনি শাসন করার ছলে হাত-পা বেঁধে প্রহার করা, ক্লাসে পাঠদান না করে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনিতে বাধ্য করা, যৌন নির্যাতন করা কোন পিতৃতুল্য শিক্ষকের কাজ হতে পারে না। শিক্ষার সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে হলে সকলের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা একান্ত কাম্য। সত্যিকারের শিক্ষক হলেন একটি মোমবাতির মতো, যাঁরা নিজে প্রজ্বলিত হয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আলো প্রদান করেন।তাদের নির্দেশনা, বন্ধুত্ব, শৃঙ্খলা, শাসন এবং ভালোবাসা- এ সবই পাওয়া যায় শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এগুলো আমাদের জীবনকে আরও বেশি সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাদের জ্ঞানের আলোতেই একজন আদর্শ নাগরিকের বিকাশ ঘটে। ‘শিক্ষক দিবসে’ শিক্ষকদের সকল পাওয়া-না পাওয়া, অভিযোগ-অনুযোগ, সম্মান-লাঞ্ছনা ইত্যাদি ভুলে গিয়ে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হওয়া জরুরি। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত, পরিবেশ ও প্রযুক্তিবান্ধব এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থাই হোক শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার।

লেখক : অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়