শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধি

 

ড. মো. নাছিম আখতার

আবহাওয়া, উর্বর ভূমি, পানির সহজলভ্যতা, মানুষের সাধারণ জীবনধারণের প্রবণতা ইত্যাদি কারণে আমাদের দেশ ছিল কৃষিপ্রধান। মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই ছিল কৃষিকে ঘিরে। বর্তমানে জনসংখ্যাধিক্যের কারণে কর্মসংস্থানের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পরিসংখ্যান মতে, দেশে কৃষিজমির পরিমাণ মাথাপিছু সাড়ে ১৬ শতাংশের কম।

এ অবস্থায় জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই আমাদের সমৃদ্ধি আনবে। জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। শক্তিশালী ও ত্রুটিহীন শিক্ষাব্যবস্থার ফসল হলো দক্ষ মানবসম্পদ। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার মাঠ পর্যায়ের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা দরকার।

kalerkantho

বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে সৃজনশীল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। পদ্ধতিটিতে সৃজনশীলতার বিকাশ কতটুকু হয়েছে তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে চার শ পৃষ্ঠার পাঠ্য বইয়ের জন্য যে এক হাজার পৃষ্ঠার গাইড বই অপরিহার্য তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। গাইড বই আবার বিভিন্ন প্রকাশনার বিভিন্ন আঙ্গিকে ও মোড়কে বের হয়েছে। একটি বিষয়ের জন্য শিক্ষকরা অনেক সময় একাধিক গাইড বই কেনারও পরামর্শ দেন। সরকার মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে বই বিতরণ করছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বইগুলোর গাইড বই কিনতে মোটা অঙ্কের অর্থ লাগে, যা একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য জুলুমও বটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পড়াশোনার মূল বিষয়বস্তু বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ে নেই, আছে গাইড বইয়ের কবজায়। ফলে কোচিং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপের সৃষ্টি হচ্ছে।

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে কোচিং সেন্টারের সাহায্য ছাড়াও একজন শিক্ষার্থী বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের গভীরে যেতে পারে। আমার সন্তানকে পড়ানোর সময় মাঝেমধ্যে আমি ইউটিউবে আপলোড করা বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যায়ভিত্তিক লেকচার দেখি। লেকচারগুলো যথেষ্ট মানসম্পন্ন ও গোছানো। একজন শিক্ষার্থী এসব লেকচার একবার দেখে না বুঝলে একাধিকবার দেখে বুঝে নিতে পারে। শিক্ষার্থীরা ইউটিউবকে শেখার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলে ভিত্তিজ্ঞানে দৃঢ়তা অর্জন করবে বলে মনে করি।

আমার সন্তানের মাধ্যমিক স্তরের সাধারণ গণিত বিষয়টি আমি পড়াই। ৯.২ অধ্যায়টি পড়াতে গিয়ে উদাহরণের ১০টি ও অনুশীলনীর ৩০টি অঙ্ক সমাধান করালাম। ওই অধ্যায়ের সৃজনশীল প্রশ্ন কেমন হবে তা গাইড বই দেখা ছাড়া কোনোভাবেই অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

স্বাভাবিকভাবেই গাইড বই থেকে ৮০টি অতিরিক্ত অঙ্ক করাতে হলো। অর্থাৎ বাস্তবিক অর্থে সিলেবাস মূল পাঠ্য বইয়ের তিন গুণ আকার ধারণ করল। প্রতিটি অধ্যায়ের জন্যই এ ধরনের বাড়তি চাপ রয়েছে। তাই সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ ও হতাশা বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, এ কারণে পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত অঙ্কগুলো অধিক অনুশীলনের সময় পাওয়া যাচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না অঙ্কে প্রত্যয়ী নতুন প্রজন্ম, যা গবেষণানির্ভর জাতি গড়তে একান্ত অপরিহার্য। সুতরাং শিক্ষার্থীর দক্ষতা বাড়াতে গাইডনির্ভর সৃজনশীল পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

সঠিক ও প্রকৃত শিক্ষা শুধু জ্ঞান দান করে না, মানুষকে প্রজ্ঞাবান করে তোলে। প্রজ্ঞা না থাকলে কোনো জ্ঞানই কাজে আসে না। জ্ঞান হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা। আর প্রজ্ঞা হলো জ্ঞানের প্রয়োগ। মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান বিভাগে ব্যাবহারিক ক্লাসের জন্য শতকরা ২৫ ভাগ নম্বর বরাদ্দ আছে। কিন্তু হাতে গোনা কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই ব্যাবহারিক ক্লাসের কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ব্যাবহারিক পরীক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত নম্বর শুধু পরীক্ষার ফলাফলে গ্রেড বৃদ্ধির জন্য নির্ধারিত। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর তত্ত্বীয় জ্ঞানার্জন হলেও ব্যাবহারিক জ্ঞানের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ব্যাবহারিক ক্লাস করতে চাইলে শিক্ষার্থীরা কেমন বিড়ম্বনায় পড়ে তা একটি বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরছি। কোনো একটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে স্কুলের সভাপতি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের পড়ালেখার সুবিধার্থে আর কী কী দরকার?’ একজন শিক্ষার্থী বলল, ‘স্যার, আমরা বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ব্যাবহারিক ক্লাস করতে চাই। ’ সভাপতি শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের এক পর্যায়ে নিয়মিত ব্যাবহারিক ক্লাস করানোর বিষয়ের ওপর জোর দেন। এর পরদিন বিজ্ঞানের কোনো এক বিষয়ের শিক্ষক ক্লাসে এসে শিক্ষার্থীদের রাগত স্বরেই বললেন, ‘যদি তোমরা স্কুলে নিয়মিত ব্যাবহারিক ক্লাস করতে চাও, তাহলে এই স্কুলে কেন? অস্ট্রেলিয়া যাও, কানাডা যাও, আমেরিকা যাও। ওখানে স্কুলে ব্যাবহারিক ক্লাস করানো হয়। ’ শিক্ষার্থীরা ওই শিক্ষকের কথায় যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য। কারণ ব্যাবহারিক ক্লাসের বিষয়গুলো পাঠক্রমের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত আছে, সেই ক্লাসগুলো স্কুলে করতে চাইলে আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে কেন? আর শিক্ষকই বা এত বিরক্ত হবেন কেন?

শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে ব্যাবহারিক ক্লাস অপরিহার্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত অনেক স্কুল-কলেজেই অবকাঠামোগত ও জনবলসংক্রান্ত সমস্যা বিদ্যমান। আবার কোথাও কোথাও আর্থিক সমস্যাও রয়েছে। ফলে ব্যাবহারিক ক্লাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা রাসায়নিক দ্রব্য জোগাড় করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিডিও কনটেন্ট নির্ভর ‘সফটল্যাব’-এর মাধ্যমে ব্যাবহারিক ক্লাস পরিচালনার বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিকস সম্পর্কিত ব্যাবহারিক ক্লাসের জন্য বিভিন্ন ধরনের সিমুলেটর আছে। এগুলোতে প্রয়োজনীয় আইসি, ট্রানজিস্টর, লজিক গেট ইত্যাদি সিলেক্ট করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বৈদ্যুতিক বর্তনী তৈরি করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিমুলেটরের জোগান দেওয়া জরুরি। তৎসঙ্গে সরকারের তরফ থেকে ব্যাবহারিক ক্লাস পরিচালনার বিষয়ে নজরদারি থাকতে হবে।

শিক্ষা বিস্তারে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার দুর্বলতাগুলো নিরসন ছাড়া জ্ঞাননির্ভর জাতি গড়ার বিষয়টি সভা, সেমিনার বা বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দেশের উন্নয়নে শিক্ষা হতে হবে কার্যকর ও উৎপাদনমুখী। অধিক জনসংখ্যার কারণে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সীমিত। তাই শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে হতে হবে সদা সতর্ক। তবেই আমাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান হবে বিশ্বময়। বেগবান হবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সমৃদ্ধ হবে দেশ।

লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও  প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধি

 

ড. মো. নাছিম আখতার

আবহাওয়া, উর্বর ভূমি, পানির সহজলভ্যতা, মানুষের সাধারণ জীবনধারণের প্রবণতা ইত্যাদি কারণে আমাদের দেশ ছিল কৃষিপ্রধান। মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই ছিল কৃষিকে ঘিরে। বর্তমানে জনসংখ্যাধিক্যের কারণে কর্মসংস্থানের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পরিসংখ্যান মতে, দেশে কৃষিজমির পরিমাণ মাথাপিছু সাড়ে ১৬ শতাংশের কম।

এ অবস্থায় জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই আমাদের সমৃদ্ধি আনবে। জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। শক্তিশালী ও ত্রুটিহীন শিক্ষাব্যবস্থার ফসল হলো দক্ষ মানবসম্পদ। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার মাঠ পর্যায়ের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা দরকার।

kalerkantho

বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে সৃজনশীল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। পদ্ধতিটিতে সৃজনশীলতার বিকাশ কতটুকু হয়েছে তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে চার শ পৃষ্ঠার পাঠ্য বইয়ের জন্য যে এক হাজার পৃষ্ঠার গাইড বই অপরিহার্য তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। গাইড বই আবার বিভিন্ন প্রকাশনার বিভিন্ন আঙ্গিকে ও মোড়কে বের হয়েছে। একটি বিষয়ের জন্য শিক্ষকরা অনেক সময় একাধিক গাইড বই কেনারও পরামর্শ দেন। সরকার মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে বই বিতরণ করছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বইগুলোর গাইড বই কিনতে মোটা অঙ্কের অর্থ লাগে, যা একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য জুলুমও বটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পড়াশোনার মূল বিষয়বস্তু বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ে নেই, আছে গাইড বইয়ের কবজায়। ফলে কোচিং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপের সৃষ্টি হচ্ছে।

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে কোচিং সেন্টারের সাহায্য ছাড়াও একজন শিক্ষার্থী বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের গভীরে যেতে পারে। আমার সন্তানকে পড়ানোর সময় মাঝেমধ্যে আমি ইউটিউবে আপলোড করা বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যায়ভিত্তিক লেকচার দেখি। লেকচারগুলো যথেষ্ট মানসম্পন্ন ও গোছানো। একজন শিক্ষার্থী এসব লেকচার একবার দেখে না বুঝলে একাধিকবার দেখে বুঝে নিতে পারে। শিক্ষার্থীরা ইউটিউবকে শেখার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলে ভিত্তিজ্ঞানে দৃঢ়তা অর্জন করবে বলে মনে করি।

আমার সন্তানের মাধ্যমিক স্তরের সাধারণ গণিত বিষয়টি আমি পড়াই। ৯.২ অধ্যায়টি পড়াতে গিয়ে উদাহরণের ১০টি ও অনুশীলনীর ৩০টি অঙ্ক সমাধান করালাম। ওই অধ্যায়ের সৃজনশীল প্রশ্ন কেমন হবে তা গাইড বই দেখা ছাড়া কোনোভাবেই অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

স্বাভাবিকভাবেই গাইড বই থেকে ৮০টি অতিরিক্ত অঙ্ক করাতে হলো। অর্থাৎ বাস্তবিক অর্থে সিলেবাস মূল পাঠ্য বইয়ের তিন গুণ আকার ধারণ করল। প্রতিটি অধ্যায়ের জন্যই এ ধরনের বাড়তি চাপ রয়েছে। তাই সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ ও হতাশা বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, এ কারণে পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত অঙ্কগুলো অধিক অনুশীলনের সময় পাওয়া যাচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না অঙ্কে প্রত্যয়ী নতুন প্রজন্ম, যা গবেষণানির্ভর জাতি গড়তে একান্ত অপরিহার্য। সুতরাং শিক্ষার্থীর দক্ষতা বাড়াতে গাইডনির্ভর সৃজনশীল পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

সঠিক ও প্রকৃত শিক্ষা শুধু জ্ঞান দান করে না, মানুষকে প্রজ্ঞাবান করে তোলে। প্রজ্ঞা না থাকলে কোনো জ্ঞানই কাজে আসে না। জ্ঞান হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা। আর প্রজ্ঞা হলো জ্ঞানের প্রয়োগ। মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান বিভাগে ব্যাবহারিক ক্লাসের জন্য শতকরা ২৫ ভাগ নম্বর বরাদ্দ আছে। কিন্তু হাতে গোনা কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই ব্যাবহারিক ক্লাসের কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ব্যাবহারিক পরীক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত নম্বর শুধু পরীক্ষার ফলাফলে গ্রেড বৃদ্ধির জন্য নির্ধারিত। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর তত্ত্বীয় জ্ঞানার্জন হলেও ব্যাবহারিক জ্ঞানের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ব্যাবহারিক ক্লাস করতে চাইলে শিক্ষার্থীরা কেমন বিড়ম্বনায় পড়ে তা একটি বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরছি। কোনো একটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে স্কুলের সভাপতি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের পড়ালেখার সুবিধার্থে আর কী কী দরকার?’ একজন শিক্ষার্থী বলল, ‘স্যার, আমরা বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ব্যাবহারিক ক্লাস করতে চাই। ’ সভাপতি শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের এক পর্যায়ে নিয়মিত ব্যাবহারিক ক্লাস করানোর বিষয়ের ওপর জোর দেন। এর পরদিন বিজ্ঞানের কোনো এক বিষয়ের শিক্ষক ক্লাসে এসে শিক্ষার্থীদের রাগত স্বরেই বললেন, ‘যদি তোমরা স্কুলে নিয়মিত ব্যাবহারিক ক্লাস করতে চাও, তাহলে এই স্কুলে কেন? অস্ট্রেলিয়া যাও, কানাডা যাও, আমেরিকা যাও। ওখানে স্কুলে ব্যাবহারিক ক্লাস করানো হয়। ’ শিক্ষার্থীরা ওই শিক্ষকের কথায় যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য। কারণ ব্যাবহারিক ক্লাসের বিষয়গুলো পাঠক্রমের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত আছে, সেই ক্লাসগুলো স্কুলে করতে চাইলে আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে কেন? আর শিক্ষকই বা এত বিরক্ত হবেন কেন?

শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে ব্যাবহারিক ক্লাস অপরিহার্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত অনেক স্কুল-কলেজেই অবকাঠামোগত ও জনবলসংক্রান্ত সমস্যা বিদ্যমান। আবার কোথাও কোথাও আর্থিক সমস্যাও রয়েছে। ফলে ব্যাবহারিক ক্লাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা রাসায়নিক দ্রব্য জোগাড় করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিডিও কনটেন্ট নির্ভর ‘সফটল্যাব’-এর মাধ্যমে ব্যাবহারিক ক্লাস পরিচালনার বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিকস সম্পর্কিত ব্যাবহারিক ক্লাসের জন্য বিভিন্ন ধরনের সিমুলেটর আছে। এগুলোতে প্রয়োজনীয় আইসি, ট্রানজিস্টর, লজিক গেট ইত্যাদি সিলেক্ট করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বৈদ্যুতিক বর্তনী তৈরি করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিমুলেটরের জোগান দেওয়া জরুরি। তৎসঙ্গে সরকারের তরফ থেকে ব্যাবহারিক ক্লাস পরিচালনার বিষয়ে নজরদারি থাকতে হবে।

শিক্ষা বিস্তারে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার দুর্বলতাগুলো নিরসন ছাড়া জ্ঞাননির্ভর জাতি গড়ার বিষয়টি সভা, সেমিনার বা বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দেশের উন্নয়নে শিক্ষা হতে হবে কার্যকর ও উৎপাদনমুখী। অধিক জনসংখ্যার কারণে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সীমিত। তাই শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে হতে হবে সদা সতর্ক। তবেই আমাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান হবে বিশ্বময়। বেগবান হবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সমৃদ্ধ হবে দেশ।

লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও  প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়